রাফিউল হাসাইন : রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থেকে গাড়ির জন্য তেল নিয়ে ফিরছিলাম। বারিধারা ডিওএইচএসের স্কুলসংলগ্ন গেট দিয়ে ঢুকতেই এক্সপ্রেসওয়ের নিচে চোখে পড়ল এক হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য—যেখানে জীবনের এক গভীর সত্য যেন নীরবে ধরা দিচ্ছিল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে গাড়ি ঘুরিয়ে কাছে গেলাম।
একটি রিকশার উপর বসে ছিল এক হাস্যোজ্জ্বল পরিবার। কয়েকটি ছোট শিশু, তাদের তরুণ বাবা-মা—সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট এক সুখের পৃথিবী। রিকশার পাদানিতে বসেছিলেন মা, সিটে বাবা কোলে নিয়ে ছিলেন ফুটফুটে শিশুকে। পাশে বসে বড় সন্তান, আর রিকশাচালকের আসনের কাছে খেলছিল আরও দুটি শিশু। কথা বলে জানলাম, বাকি দুটি শিশু আসলে সেই তরুণীর ভাই-বোন। তাদের গ্রামের বাড়ি নান্দাইলে, বর্তমানে পাশের একটি বস্তিতে বসবাস।
দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা তাদের ঘিরে থাকলেও চোখে-মুখে ছিল অপার্থিব প্রশান্তি। জিজ্ঞেস করতেই সহজ হাসিতে বলল, “ভালো আছি।”
সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল যে দৃশ্যটি—তারা সবাই মিলে মাত্র তিনটি সিঙ্গারা ভাগ করে খাচ্ছিল। নেই কোনো অভিযোগ, নেই কোনো অস্থিরতা। সামান্য খাবারটুকু পরম মমতায় ভাগ করে নিচ্ছিল তারা। খালি গায়ে, মুক্ত বাতাসে, প্রকৃতির ছায়াতলে তাদের হাসিমাখা মুখ যেন বলে দিচ্ছিল—সুখ আসলে প্রাচুর্যে নয়, ভালোবাসায়।
আজকের সমাজে মানুষ অর্থ, পদবি ও বিত্তের পেছনে নিরন্তর ছুটছে। সবকিছু থাকার পরও যেন শান্তির অভাব। অথচ সেই দিন এক্সপ্রেসওয়ের নিচে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম সুখের এক নির্মল রূপ—যেখানে সীমাবদ্ধতার মাঝেও আছে পরিপূর্ণতা।
এই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে, প্রকৃত সুখ লুকিয়ে থাকে সন্তুষ্টি, ত্যাগ ও পারস্পরিক ভালোবাসার ভেতর। যদি একে অপরকে গ্রহণ করার, কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা থাকে, তবে কোনো দারিদ্র্য মানুষের অন্তরের আনন্দ কেড়ে নিতে পারে না।
রিকশার উপর বসে থাকা সেই পরিবারটি যেন নিঃশব্দে শিখিয়ে দিল—আসল শান্তি বাইরের প্রাচুর্যে নয়, মনের গহীনের নির্মল ভালোবাসায়।
দৈনিক সংসদ প্রতিদিন